মানুষের জীবন আসলে এক ধারাবাহিক পরীক্ষা। কখনো দারিদ্র্যতা, কখনো রোগ-ব্যাধি, আবার কখনো সম্পদ ও সুখ-সমৃদ্ধি দিয়ে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের পরীক্ষা করেন। অনেক সময় মানুষ দুঃখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু সুখ ও প্রাচুর্যের সময় সেই স্মৃতি ভূলে যায়। এই বাস্তবতাটাই আল্লাহর রাসুল (সা.) বনি ইসরাঈলের তিন ব্যাক্তির বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবি কারিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, বনি ইসরাইলে তিন ব্যক্তি ছিল; একজন কুষ্ঠ রোগী, দ্বিতীয়জন টাকলা এবং তৃতীয়জন অন্ধ। একদিন আল্লাহ তাআলা তাদের পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাদের কাছে একজন ফেরেশতা প্রেরণ করলেন।
তখন ফেরেশতা (প্রথমে) কুষ্ঠ রোগীর কাছে গিয়ে বললেন, তোমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী? সে বলল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। আর যে রোগের কারণে মানুষজন আমাকে ঘৃণা করে, আমি চাই এই রোগ আমার থেকে দূর হোক।
ফেরেশতা তার শরীরে হাত বোলালেন। ফলে (আল্লাহর নির্দেশে) তার এই মন্দ রোগ চলে গেল এবং তাকে সুন্দর রঙের চামড়া প্রদান করা হলো। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞাস করলেন, তোমার নিকট শ্রেষ্ঠ সম্পদ কোনটি? সে বলল, উট কিংবা গাভি। ফলে তাকে দশ মাসের গর্ভবতী একটি উটনি দেওয়া হলো।
তারপর তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে এতে বারাকাহ দান করুন।
এরপরে ওই ফেরেশতা টাকলার কাছে এসে বললেন, তোমার কাছে পছন্দনীয় জিনিস কী? সে বলল, সুন্দর চুল এবং মানুষের কাছে আমার ঘৃণিত এই রোগ দূরীভূত হওয়া। অতঃপর তিনি তার মাথায় হাত বোলালেন, ফলে তার রোগ চলে গেল এবং তাকে সুন্দর চুল দেওয়া হলো। অতঃপর তিনি তাকে জিজ্ঞাস করলেন, তোমার কাছে পছন্দনীয় সম্পদ কোনটি? উত্তরে সে বলল, গরু। তখন তাকে একটি গর্ভবতী গাভি দেওয়া হলো।
ফেরেশতা তাকে বললেন, আল্লাহ তোমার জন্য বারাকাহ দান করুন।
এরপরে ফেরেশতা অন্ধের কাছে এসে বললেন, তোমার কাছে সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কী? উত্তরে সে বলল, আমি চাই মহান আল্লাহ তাআলা আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবেন, যাতে আমি লোকদের দেখতে পারি। ফেরেশতা অন্ধ লোকের চোখে হাত বোলালেন। ফলে আল্লাহ তাকে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা বললেন, তোমার প্রিয় সম্পদ কী? সে বলল, বকরি। তাকে একটি গর্ভবতী বকরি দেওয়া হলো। এরপরে ওই দুজনের পশুপাল বাড়তে থাকল এবং এই অন্ধের ছাগলটিও বাচ্চা প্রসব করল। এভাবে একজনের উপত্যকা সমপরিমাণ উট, আরেকজনের এক উপত্যকা সমপরিমাণ গরু এবং আরেকজনের এক উপত্যকা সমপরিমাণ বকরি হয়ে গেল।
এবার ফেরেশতা (ভিন্নরূপ ধারণ করে) প্রথমে কুষ্ঠরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন গরিব লোক। সফরে আমার সকল পাথেয় নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাই নিজ দেশে পৌঁছানোর মতো প্রথমে আল্লাহ অতঃপর তোমার সাহায্য ছাড়া আমার আর কোনো রাস্তা দেখছি না। সে জন্য আমি ওই সত্তার নামে তোমার কাছে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া দান করেছেন; যার মাধ্যমে আমি আমার এই সফরে বাড়ি পৌঁছাতে পারব। উত্তরে সে বলল, এই সম্পদে অনেক মানুষের হক রয়েছে। (তাই আমি তোমাকে দিতে পারব না।)
তখন ফেরেশতা বললেন, তোমাকে আমি চিনি মনে হচ্ছে। তুমি কি কুষ্ঠরোগী ছিলে না? লোকেরা তোমাকে ঘৃণা করত না? তুমি কি গরিব ছিলে না, আল্লাহ তাআলা তোমাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন? জবাবে সে বলল, (আরে নাহ) এ ধন-সম্পদ তো আমি বাপ-দাদা থেকে ওয়ারিশসূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যা বলো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন।
এবার ফেরেশতা টাকলার কাছে এসে তাকেও অনুরূপ কথা বললেন। কুষ্ঠরোগী যে উত্তর দিয়েছিল, সেও একই রকম উত্তর দিল। সে জন্য ফেরেশতা তাকেও বললেন যে, যদি তুমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো, তাহলে আল্লাহ তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন।
তারপর তিনি সর্বশেষ ব্যক্তি-অন্ধের নিকট এসে বললেন যে, আমি একজন মিসকিন ও মুসাফির মানুষ; সফরের যাবতীয় পাথেয় শেষ হয়ে গেছে। ফলে বাড়ি পৌঁছানোর মতো প্রথমে আল্লাহ অতঃপর তোমার সাহায্য ছাড়া আজ আমার কোনো উপায় নেই। সুতরাং আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি বকরি চাই, যিনি তোমার চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছেন, যার দ্বারা আমি আমার এই সফরের প্রান্তে যেতে পারি। সে বলল, অবশ্যই আমি অন্ধ ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর এসব আল্লাহরই দান। তুমি এখান থেকে যা ইচ্ছে নিয়ে নাও, আর যা ইচ্ছে রেখে যাও। আল্লাহর কসম। আজ তুমি আল্লাহর জন্য যা গ্রহণ করবে, সে ব্যাপারে আমি তোমাকে কোনো বাধা বা নিষেধ করব না।
এবার ফেরেশতা বললেন, তুমি তোমার বকরি তোমার কাছেই রেখে দাও। আসলে তোমাদের পরীক্ষা করা হলো। (তোমার এই কৃতজ্ঞতার কারণে) আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার অপর দুই সঙ্গীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৬৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৪৩১)
